বিশ্বরাজনীতিতে রাশিয়ার কাছে কি যুক্তরাষ্ট্র হেরে যাচ্ছে? - Bangladeshi News

Top News Site In Bangladesh

Breaking

Home Top Ad

Post Top Ad

Saturday, 25 August 2018

বিশ্বরাজনীতিতে রাশিয়ার কাছে কি যুক্তরাষ্ট্র হেরে যাচ্ছে?


যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এ পর্যন্ত ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দেশের অভ্যন্তরীণ ও বহিরাষ্ট্রিক ক্ষেত্রে যেসব নীতি গ্রহণ করেছেন, সেগুলোর বেশির ভাগ তাঁকে নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ, বিতর্কিত ও দুর্বল করে রেখেছে। গত শতাব্দীর শেষ দশকে স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হলে কমিউনিজমের পতন ও পুঁজিবাদের বিশ্ব জয়ের যে তত্ত্বগুলো এ পর্যন্ত প্রচার করা হয়েছে, সেগুলোও এখন নতুন করে লেখার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে আশাবাদীরা এই ভেবে আশ্বস্ত যে তিনি শরণার্থী, অভিবাসন, সীমান্ত নীতি ও আয়কর নীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি শক্তিশালী করতে চেয়েছেন। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ন্যাটোতে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্রাতিরিক্ত অর্থ ব্যয়ের সংকোচন, বাণিজ্য অবরোধ, চীন, এশিয়া, ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্যে সংরক্ষণবাদ প্রভৃতি নীতির মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতিকে বেগবান করতে পারবেন বলে তাঁর নেতৃত্বের প্রতি আস্থাশীল পক্ষ বিশ্বাস করে আছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, ইতিহাস যুক্তরাষ্ট্রকে শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক অবস্থা সংহত করার প্রত্যয় ছুড়ে দেয়নি, বরং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক অঙ্গীকার ও আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার সঙ্গে দেশটিকে বেঁধে রেখেছে অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে। বৈশ্বিক ঘটনাপ্রবাহ, বৈশ্বিক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও স্ট্র্যাটেজিক বাস্তবতাকে এড়িয়ে শুধু যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রিক বিষয়গুলো সুরাহা করার গণ্ডিবদ্ধ দায়িত্ব পালন দেশটির নেতৃত্বের সঙ্গে মানানসই নয়। সম্ভবত রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, রাষ্ট্রনীতিক দূরদৃষ্টি ও বৈশ্বিক নেতৃত্বের স্পৃহা ব্যাবসায়িক ট্রাম্পকে ছুঁয়ে যাচ্ছে না। নিরাশাবাদীরা তাই দিন দিন হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের হঠকারী, অদূরদর্শী ও স্বার্থান্ধ জাতীয়তাবাদী নীতি যুক্তরাষ্ট্রের বহিঃইমেজকে তিল তিল করে নষ্ট করে দেশটির বৈশ্বিক নেতৃত্বের যোগ্যতাকে শুধু প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বিশ্বনেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ব্যর্থতার ভবিষ্যদ্বাণীও করছে অনেকে। নিরাশাবাদীরা রাশিয়ার উত্থান ও পুতিনের বৈশ্বিক নেতৃত্বের কাছে যুক্তরাষ্ট্রের ম্লান হয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও প্রকাশ করছে। প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার পর তাঁর ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতিকে অনেকে শ্রদ্ধার ও আশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেছিল। কিন্তু অচিরেই তারা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে যুক্তরাষ্ট্র ‘মনরো মতবাদ’ অনুসরণ করে বিশ্বরাজনীতি থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখে। ইউরোপের ব্রিটেন, ফ্রান্স ও অন্যান্য এলাকার অধিবাসীরা এক টুকরো রুটি ও ধর্ম পালনের স্বাধীনতা লাভের জন্য আটলান্টিক মহাসাগরের উন্মত্ত তরঙ্গাভিঘাত অতিক্রম করে লোহিত ভারতীয়দের (Red Indian) স্বদেশভূমির সুজলা, সুফলা, শস্য-শ্যামলিমাময়, হ্রদ, বন-বীথিকা, সমুদ্র, পর্বত রাজ্যে পাড়ি জমাতে থাকে। শরণার্থী ও অভিবাসন প্রক্রিয়ায় আসা ইউরোপীয়রা আস্তে আস্তে লোহিত ভারতীয়দের ধ্বংস করে তাদের ভূমিতে আজকের যুক্তরাষ্ট্র নামের রাষ্ট্রটি গড়ে তোলে। নতুন এ রাষ্ট্রটি ১৭৭৬ সালের পর স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন সেই রাষ্ট্রটির সুদৃঢ়করণের লক্ষ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদের প্রয়োজন ছিল। সে কারণে সেই বিচ্ছিন্নতাবাদী নীতি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগ পর্যন্ত যুক্তিযুক্ত ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রকে সেই নীতি বৈশ্বিক নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজনীয় সব শক্তি জুগিয়েছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নিয়ে বিশ্বযুদ্ধের ময়দানে মিত্রশক্তির কাণ্ডারি ভূমিকা পালন করে, বিশ্বযুদ্ধোত্তর কালের বিশ্বব্যবস্থা, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা বিনির্মাণে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব সেই সত্যটিকে তুলে ধরে।

স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামার ‘ইতিহাসের সমাপ্তি’ তত্ত্ব যুক্তরাষ্ট্রের একক বৈশ্বিক নেতৃত্বের অপরিহার্যতার তাত্ত্বিক যৌক্তিকতা উপস্থাপন করে। যদিও এ তত্ত্বের অসারতা প্রমাণিত হয় এবং এর বিপরীতে হান্টিংটনের ‘সভ্যতার দ্বন্দ্ব’, কুপচানের ‘আমেরিকার ক্ষয়তত্ত্ব’ শীর্ষক থিসিসগুলো উপস্থাপিত হতে থাকে।

স্নায়ুযুদ্ধের অবসান হলেও রাশিয়া সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের বিশ্বশক্তির ইমেজে আপ্লুত থাকে। পুতিনের মতো সাহসী, শক্তিশালী, লৌহমানবরা রাশিয়াকে স্নায়ুযুদ্ধোত্তর মৃত অবস্থা থেকে উদ্ধার করে বৈশ্বিক নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত রাখার প্রচেষ্টা চালান। যুক্তরাষ্ট্রের নেতারা রাশিয়ার এ পুনরুত্থান মোকাবেলায় তাদের বৈশ্বিক নেতৃত্বের তাৎপর্যকে ঊর্ধ্বে রেখেছেন সব সময়। সম্ভবত প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বৈশ্বিক নেতৃত্বের এ স্পর্শকাতর বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছেন না, যা দেশটির বৈশ্বিক নেতৃত্বকে দুর্বল করে দিচ্ছে।

ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্র শরণার্থী ও অভিবাসীদের দেশ। ফ্রান্সের পূর্বসূরিরাও অভিবাসী। সেই বাস্তবতা ভুলে গিয়ে অভিবাসন নীতিতে তিনি এমন কঠোর সংরক্ষণবাদ অনুসরণ করেন, যা তাঁকে বহির্বিশ্বে বিচ্ছিন্ন করে রাখে। মেক্সিকোর সঙ্গে দেয়াল নির্মাণ করে এবং শিশুদের সঙ্গে মা-বাবাকে বিচ্ছিন্ন করে তাঁর অনুসৃত অভিবাসন নীতি অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ট্রাম্পকে অনেকটা বন্ধুহীন করে ফেলে। মানবাধিকারের চারণভূমি যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে বিশ্বে নিঃসঙ্গ হতে যাচ্ছে। পুঁজিবাদের পূর্ণ বিকাশে উৎপাদন প্রক্রিয়া বেগবান হলে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন শুরু হয়। পৃথিবীর অস্তিত্ব হুমকিতে পড়ার পর পরিবেশবাদী আন্দোলন শুরু হয় এবং একসময় বিশ্বনেতারা বিশ্বকে বাঁচাতে জলবায়ু চুক্তিতে আবদ্ধ হন। প্যারিস চুক্তি এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সেই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে বেরিয়ে আসার কথা বললে বিশ্ববাসী আহত হয় প্রচণ্ডভাবে।

বিশ্বরাজনীতির কেন্দ্রীয় সমস্যা এখন মধ্যপ্রাচ্যে, যার কেন্দ্রে রয়েছে ইসরায়েল-ফিলিস্তিন ইস্যু। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বনেতারা যখন ‘দ্বিরাষ্ট্রিক’ সমাধানের প্রস্তাব গ্রহণের দ্বারপ্রান্তে, তখন তা ভূলুণ্ঠিত করে নগ্নভাবে ইসরায়েলের দখলদারির পক্ষে থেকে, ফিলিস্তিনের নিধনযজ্ঞে ইসরায়েলকে উসকে দিয়ে ও জেরুজালেমে ইসরায়েলের রাজধানী প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করে, সর্বোপরি জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস স্থানান্তর করে, মধ্যপ্রাচ্যের সমস্যাকে চিরস্থায়ী করে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিশ্বরাজনীতিতে এক জটিল, মীমাংসার অযোগ্য অধ্যায় জিইয়ে রেখেছেন।

ইরানের সঙ্গে পঞ্চশক্তি এবং রাষ্ট্রগুলো পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করে ইরানের পারমাণবিকায়ন প্রক্রিয়া বন্ধ করার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে ওই চুক্তি থেকে সরিয়ে নিয়ে ইরানের মতো অভিঘাত আপসহীন ও সাহসী দেশকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে উদ্বুদ্ধ করে বিশ্ব নিরাপত্তার প্রতি একটি ঝুঁকি তৈরি করেছেন। উভয় কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনার পর উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রায়নের পথ বন্ধ করে কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি প্রতিষ্ঠার সুযোগ বারবার হাতছাড়া হচ্ছে ট্রাম্পের যথাযথ ফলপ্রসূ উদ্যোগের অভাবে।

ইইউ ও চীনের সঙ্গে বাণিজ্য সংরক্ষণবাদ নীতি গ্রহণ করে এশিয়া ও ইউরোপের সঙ্গে রীতিমতো বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। অনেক নিরাপত্তা বিশ্লেষক আশঙ্কা করছেন হয়তো বা এ বাণিজ্য যুদ্ধ বিশ্বকে মারাত্মক সংকট, অর্থনৈতিক মন্দা, এমনকি আরেকটি বিশ্বযুদ্ধের দিকেও ঠেলে দিতে পারে।

এভাবে একে একে ট্রাম্প অনুসৃত অভ্যন্তরীণ ও পররাষ্ট্রনীতিগুলো যুক্তরাষ্ট্রকে বহির্বিশ্বে দুর্বল করে তুলছে এবং স্নায়ুযুদ্ধকালীন প্রতিপক্ষ রাশিয়াকে ক্রমে শক্তিশালী করে তুলছে। রাশিয়ার সহায়তায় সিরিয়ার সরকারি বাহিনী যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত বিদ্রোহীদের কাছ থেকে সব গুরুত্বপূর্ণ এলাকা এরই মধ্যে দখল করে নিয়েছে। এমনকি ইসরায়েল অধিকৃত গোলান এলাকার সঙ্গে সংযুক্ত সিরিয়ায় ভূমিও এখন বাশার বাহিনীর করতলগত। ইরান ও রাশিয়ার সহায়তায় বাশার তাঁর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত বিদ্রোহীদের এক এক করে দমন করে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা ও রাশিয়ার শক্তিমদমত্ততার কাহিনি তৈরি করছে।

ট্রাম্পের দুর্বলতা ও পুতিনের শক্তিমানতার উৎকৃষ্ট উদাহরণ তৈরি হয়েছে সদ্য সমাপ্ত হেলসিংকি কনফারেন্সে। পুতিনের কাছে তিনি রীতিমতো ধরাশায়ী হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রাশিয়ার হস্তক্ষেপের ইস্যু নিয়ে তিনি পুতিনের সুরেই কথা বলেছেন।

এমতাবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব ধরে রাখতে হলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে বৈশ্বিক ইস্যুগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের আবহমান রাজনৈতিক সংস্কৃতির উপাদান বিবেচনায় নিয়েই এগোতে হবে। বিশ্বনেতৃত্বের জন্য যে ধরনের বৈশ্বিক উদারতা ও মহানুভবতার প্রয়োজন, সেই বৈশিষ্ট্য যুক্তরাষ্ট্রকে ধারণ করতে হবে।

লেখক : অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

mramin68@yahoo.com



from BdNews24 https://ift.tt/2NjwSkG

No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Pages