বিশ্ব মুদ্রাবাজার টালমাটাল এবং আমাদের জন্য শিক্ষা - Bangladeshi News

Top News Site In Bangladesh

Breaking

Home Top Ad

Post Top Ad

Saturday, 25 August 2018

বিশ্ব মুদ্রাবাজার টালমাটাল এবং আমাদের জন্য শিক্ষা

সবার দৃষ্টি এখন তুরস্কের দিকে, তুরস্কের মুদ্রা লিরা মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানে ৪০ শতাংশ মান হারিয়েছে খোলাবাজারে ইউএস ডলারের বিপরীতে। কারণটা হলো তুরস্কের অর্থনীতি যে দুর্বল হয়েছে তা নয়। কারণটা হলো তুরস্কের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ হুমকি। কয়েকটা পণ্যে যুক্তরাষ্ট্র উচ্চ শুল্ক আরোপ করেছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন ধর্মযাজককে না ছাড়লে আরো কঠোর কিছু করা হবে। বাহ, এতেই তুরস্কের মুদ্রার মূল্য পড়তে শুরু করেছে! আর পড়াটাই স্বাভাবিক। পৃথিবীতে এ পর্যন্ত কোনো দেশের মুদ্রাই তার মান ধরে রাখতে পারেনি, যেখানে যুক্তরাষ্ট্র বৈরী আচরণ করেছে। ঠিক একই কারণে ইরানের মুদ্রাও মূল্য হারিয়েছে। ভেনিজুয়েলাতে অবস্থা আরো ভয়াবহ। ভারতীয় মুদ্রা এক দশকের মধ্যে ডলারের (US$) বিপরীতে সর্বনিম্নে বেচাকেনা হচ্ছে। এখন এক ডলারের বিপরীতে ভারতকে ৭০ রুপি দিতে হচ্ছে। অবস্থা আরো অবনতি হতে পারে, যদি ভারতের চলতি হিসাবে ঘাটতি আরো বড় হতে থাকে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মুদ্রার মান তখনই পড়ে, যখন কোনো দেশ রপ্তানির থেকে আমদানি বেশি করে। মুদ্রার মানের নিম্নমুখী প্রকারের অন্য সূত্র হলো অর্থনীতি যদি খারাপ হয়ে যায়। খারাপ হয়ে গেলে অভ্যন্তরীণ বাজারে আয়প্রবাহ কমে যাবে। মূল্যস্ফীতি বাড়তে পারে। তখন তো অন্য মুদ্রার বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রার মান কমতেই থাকবে। কোনো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি বাছবিবেচনা না করেই অধিক মুদ্রা বাজারে ছাড়তে থাকে, তাহলেও স্থানীয় মুদ্রার মূল্য পড়ে যাবে।

মুদ্রাগুলোর পারস্পরিক বিনিময় হার কত হবে, সেটার সর্বজন গৃহীত তত্ত্ব হলো মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা। কোনো মুদ্রার ক্রয়ক্ষমতা পড়ে গেলে বা অর্থনীতিতে মূল্যস্ফীতি সৃষ্টি হলে, সেই দেশের মুদ্রার মান অবশ্যই পড়ে যাবে। এতে কারো কিছু বলারও থাকে না। চলতি হিসাবে ঘাটতি হতে থাকলে রিজার্ভ মুদ্রার চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে একটি মিস-ম্যাচ (miss-macth) তৈরি হয়। রিজার্ভ মুদ্রার চাহিদা বাড়তে থাকলে ওই মুদ্রার বিনিময়মূল্য তো বাড়বেই। রিজার্ভ মুদ্রা হলো মাত্র কয়েকটি, যেগুলোর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দেনা-পাওনা শোধ করা হয়। এগুলোর মধ্যে টপে আছে ইউএস ডলার। অন্যগুলো হলো—ইউরো, জাপানিজ ইয়েন, ব্রিটিশ পাউন্ড ও অস্ট্রেলীয় ডলার। দুই বছর আগে চায়নিজ মুদ্রা ইউয়ান (yuan) রিজার্ভ মুদ্রা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। তবে সত্য হলো, আজও আন্তর্জাতিক লেনদেনের ৫০ শতাংশ সম্পন্ন হয় ইউএস ডলারে। আর এখানেই আজও যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা। তারা ধমক দিলে, শুল্ক বসালে অথবা যুদ্ধের কথা বললে ছোট অর্থনীতির মুদ্রার মূল্য পড়তে থাকে। তুরস্কের ক্ষেত্রে এখন যা হচ্ছে তা হলো হুমকি, আরো শক্ত কিছু আসছে বলে হুংকার।

ট্রাম্প অনেককেই হুমকি দিয়ে চলেছেন। এর মধ্যে ইরান-ভেনিজুয়েলা তো আছেই। তাঁর তালিকায় নতুন যোগ হয়েছে তুরস্ক। তুরস্ক মার্কিনদের সামরিক জোট ন্যাটোতে (Nato) দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনা সরবরাহকারী দেশ। সে কারণেও ট্রাম্পের বিবেচনায় তুরস্কের অপরাধ অনেক। প্রথম হলো তুরস্কের বর্তমান প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান রাশিয়া-ইরানের সঙ্গে মিলে সিরিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। দ্বিতীয় অপরাধ হলো এরদোয়ান বিরোধীদের দমনের নামে মার্কিনপন্থীদের কারাগারে পাঠিয়েছেন। তৃতীয় অপরাধ হলো এভাঞ্জেলিক্যাল বিশপকে তুরস্ক আটকে রেখেছে সন্ত্রাসবাদের উসকানিদাতার অভিযোগ এনে। এভাঞ্জেলিক্যাল ধর্মীয় গোষ্ঠী ট্রাম্পের কাছে অনেক প্রিয়। এই মতের খ্রিস্টানদের সংখ্যা হলো যুক্তরাষ্ট্রের মোট ভোটারের ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ। তাদের ভোট চিরায়তভাবে রিপাবলিকান প্রার্থীই পান। ট্রাম্প নিজেও একজন এভাঞ্জেলিক্যাল খ্রিস্টান। তাঁর ভাইস প্রেসিডেন্ট পেন্সও। তাঁদের কাছে একজন এভাঞ্জেলিক্যাল বিশপের মূল্য অনেক। তাই আপাতত ওই বিশপের জন্যই ট্রাম্প প্রশাসন তুরস্ককে একহাত দেখে নেবে বলে হুমকি দিচ্ছে। কোনো ছোট দেশ যখন যুক্তরাষ্ট্রীয় হুমকির মধ্যে পড়ে তখন স্বাভাবিকভাবে ওই দেশের বিনিয়োগ ও বিদেশি সম্পদের প্রবাহ কমে যায়। উল্টো বিদেশিরা ও ধনী স্বদেশিরাও তাদের সম্পদ বিক্রি করে কথিত হার্ড কারেন্সিতে (hard currency) রূপান্তর করতে চায়। এ ক্ষেত্রেও ডলারের চাহিদা অনেক বেড়ে যায়; যার প্রতিফলনে আমরা দেখছি, তুরস্কের মুদ্রা লিরা ৪০ শতাংশ মান হারিয়েছে।

হ্যাঁ, এসব পরিস্থিতিতে অন্য অনেক দেশ সম্পদ বেচে আপাতত ডলারে রূপান্তরের ওপর বিধি-নিষেধ জারি করে; যেমন করেছিল ১৯৯৭ সালে মাহাথির মোহাম্মদের মালয়েশিয়া। সম্পদ বেচা যাবে, তবে বিদেশি মুদ্রায় পূর্ণ আয়কে বাইরে নেওয়া যাবে না—এই নীতিকে অর্থনীতির ভাষায় বলা হয় ক্যাপিটাল কন্ট্রোল (Capital Control)। এটা নির্ভর করে সার্বিক অবস্থার ওপর। তুরস্কের ক্ষেত্রে সেটার প্রয়োজন না-ও হতে পারে। কিছু বন্ধু রাষ্ট্র এরই মধ্যে বৈদেশিক বিনিয়োগ নিয়ে তুরস্কের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়েছে। চীন-রাশিয়া-ফ্রান্স-জার্মানি যদি তুরস্কের এই দুর্দিনে তুরস্কের পক্ষ নেয়, তাহলে ট্রাম্পের হুমকি তুরস্ককে টলাতে পারবে না। তুরস্কের অর্থনীতির আকার হলো প্রায় ৯০০ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রায় তিন গুণ। তুরস্কের অর্থনীতির বড় রকমের কোনো দুর্বলতা নেই। তবে হুমকির মধ্যে থাকলে একসময় অর্থনীতির অবস্থা খারাপের দিকেও যেতে পারে। সেই খারাপ যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও হতে পারে। আমরা এত দিন থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সুবিধা নিয়ে যা কিছু করেছি, ট্রাম্প প্রশাসন সেসব অগ্রগতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এতে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। আপাতত করহার (Tax-rate) কমানোর কারণে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতির সূচকগুলো ট্রাম্পের পক্ষে। সেই অর্থনীতিকে তারা এখন ভোটারদের মধ্যে বেচতে চাইছে। সেই বেচায় যদি তারা সফল হয়, তাহলে আগামী নভেম্বরে যে মধ্যবর্তী নির্বাচন হবে, তাতে তাঁর পছন্দের লোকেরা জয়ী হবেন। কিন্তু আমাদের বিদ্যা বলে, অর্থনীতিতে এই ভালো অবস্থা সাময়িক। দীর্ঘ মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হবে। প্রেসিডেন্ট যখন মূর্খ হন তখন কারো কথা শোনেন না। ট্রাম্পের ক্ষেত্রেও তাই। সেই প্রেসিডেন্ট যুক্তরাষ্ট্রকে ‘First’ বানাতে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে একঘরে করে ফেলছেন। তাঁর পক্ষে সুবিধাভোগীরা এখনো আছে। তারা টের পাবে ট্রাম্প কী ক্ষতি করছেন, তা অল্প কয়েক বছরেই।

আজকে যে অবস্থায় ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রকে নিয়ে এসেছেন, এর ফল হবে এই যে অনেক রাষ্ট্র লেনদেনে ইউএস ডলার ব্যবহার করতে চাইবে না। একসময় আন্তর্জাতিক লেনদেনের ৭০ শতাংশ ডলারে নিষ্পন্ন হতো। এখন কি সেই অবস্থা আছে? চীন কয়েক বছরের মধ্যেই অর্থনীতির ক্ষেত্রে প্রথম স্থান অধিকার করবে। অন্য ছোট দেশগুলো এরই মধ্যে চায়নিজ মুদ্রা ইউয়ানকে লেনদেনের মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বাংলাদেশও ইউয়ানে লেনদেন নিষ্পন্ন করা যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বন্ধু হারাচ্ছে। সেই সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক আধিপত্য। এটা এখনো যুক্তরাষ্ট্রের পলিসি মেকাররা বুঝছে না। তারা এখনো অতীতের স্বপ্নের মধ্যে আছে। গত ১০ বছরে বিশ্ব আর্থিক ব্যবস্থা অনেক বদলে গেছে। কথায় কথায় রাষ্ট্রগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রিত আইএমএফের কাছে ডলার-ইউরোতে সাহায্যের জন্য যায় না। এখন তারা বিকল্প সাহায্যের দিকে যেতে শুরু করেছে। বাংলাদেশের মুদ্রা টাকাও ডলারের বিরুদ্ধে ১৫ থেকে ১৭ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে গত দুই বছরে। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিষয়টি স্বাভাবিক। এমনটা হতেই পারে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও চলতি হিসাবে ঘাটতি বেড়েই চলেছে। বাংলাদেশকে কাপড় অনুযায়ী কোট সেলাই করতে হবে। সাধ্যের বাইরে চলতে চেষ্টা করা ঠিক হবে না। পাকিস্তানের মুদ্রাও মান হারিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার রুপিও মান হারিয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে বিষয়টি অতি স্বাভাবিক। ইউএস ডলার বিশ্বব্যাপী অন্য মুদ্রার বিপরীতে শক্তিশালী অবস্থানে আছে। সুতরাং বাংলাদেশের টাকার, ইন্দোনেশিয়ার রুপির বিপরীতে ইউএস ডলারের বিনিময় হার বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক।

লেখক : অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।



from BdNews24 https://ift.tt/2MAgqAr

No comments:

Post a Comment

Post Bottom Ad

Pages