
সকাল আনুমানিক সাড়ে ৮টা। খাগড়াছড়ি শহরের স্বনির্ভর বাজারের সব দোকান তখনও খোলেনি। শনিবার সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় বাজারে বিকিকিনির জন্য সবেমাত্র মানুষ আসতে শুরু করেছে। বাজারের উত্তর পাশেই আঞ্চলিক দল ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) প্রধান কার্যালয়। বাজার এলাকায় দুপুরে ইউপিডিএফ ও সহযোগী সংগঠনের ব্যানারে পূর্বনির্ধারিত সমাবেশ থাকায় গতকাল সকাল থেকেই সেখানে সংগঠনটির নেতাকর্মীরা জড়ো হতে শুরু করেন। এমন সময় বাজারের উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ব্রাশফায়ার করতে করতে সামনের দিকে আসতে থাকে একদল দুর্বৃত্ত। অস্ত্রের গর্জনে প্রকম্পিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। দুর্বৃত্তদের অতর্কিত হামলায় মূল সড়ক থেকে বাজারের দোকান পর্যন্ত রক্তে রঞ্জিত হয়ে ওঠে। গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান ইউপিডিএফভুক্ত পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সভাপতি তপন চাকমাসহ ছয়জন। আহত হন অন্তত তিনজন। ঘটনার পর চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এর পরপরই সদরের পেরাছড়া এলাকায় আবারও হামলার শিকার হন ইউপিডিএফ সমর্থকরা। ওই হামলায় গুলিবিদ্ধ হন নারীসহ চারজন। হাসপাতালে নেওয়ার পর তাদের একজনের মৃত্যু হয়।
ইউপিডিএফ এ ঘটনায় সংস্কারপন্থি জনসংহতি সমিতি ও নব্য মুখোশধারীদের দায়ী করেছে। সংগঠনটির অভিযোগ, প্রশাসনের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় এ হামলা হয়েছে। তারা জড়িতদের অবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। হামলার প্রতিবাদে আগামীকাল সোমবার জেলায় আধাবেলা শান্তিপূর্ণ সড়ক অবরোধ ডেকেছে ইউপিডিএফভুক্ত তিন সংগঠন পিসিপি, গণতান্ত্রিক যুব ফোরাম, হিল উইমেন্স ফেডারেশন খাগড়াছড়ি জেলা শাখা। পিসিপির দপ্তর সম্পাদক সমর চাকমার পাঠানো বিবৃতিতে এ কর্মসূচি ঘোষণার কথা জানানো হয়।
পাহাড়ি সংগঠনগুলোর নিজেদের কোন্দলের কারণে দিন দিন লাশের মিছিল দীর্ঘ হচ্ছে। বারবার রক্তে লাল হচ্ছে সবুজ পাহাড়। এর পরিণতিতে গত ৯ মাসে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৩৫ জন। সর্বশেষ ৩ মে রাঙামাটির নানিয়ারচর উপজেলায় নিজ কার্যালয়ের সামনে গুলি চালিয়ে উপজেলা চেয়ারম্যান ও জেএসএসের (এমএন লারমা) অন্যতম শীর্ষ নেতা শক্তিমান চাকমাকে হত্যা করা হয়। একদিন পরেই তার দাহক্রিয়ায় অংশ নিতে যাওয়ার পথে আবারও সশস্ত্র হামলা হয়। ওইদিন ব্রাশফায়ারে নিহত হন ইউপিডিএফ গণতান্ত্রিকের প্রধান তপন জ্যোতি চাকমা বর্মাসহ ছয়জন।
গতকাল গুলিতে নিহত অন্য পাঁচজন হলেন- পিসিপির খাগড়াছড়ি জেলা শাখার সহ-সাধারণ সম্পাদক এলটন চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের (ডিওয়াইএফ) জেলা সভাপতি পলাশ চাকমা, প্রকৌশলী ধীরাজ চাকমা, রুপন চাকমা ও জিতায়ন চাকমা। তাদের মধ্যে ধীরাজ চাকমা, রুপন চাকমা ও জিতায়ন চাকমা সাধারণ মানুষ। আর পেরাছড়ায় নিহত সন কুমার চাকমা ভাইবোনছড়ার ৫ নম্বর যৌথ খামার এলাকার বাসিন্দা। ইউপিডিএফ সমর্থক সন কুমার সমাবেশ উপলক্ষে মিছিলের সঙ্গে স্বনির্ভর বাজারে আসছিলেন। ইউপিডিএফ ও সহযোগী সংগঠনের ব্যানারে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে স্বনির্ভর বাজারে ওই সমাবেশের আয়োজন করা হয়েছিল।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সমাবেশ উপলক্ষে স্বনির্ভর বাজারে আসেন তপন চাকমা, এলটন চাকমা ও পলাশ চাকমা। তারা অন্য নেতাকর্মীদের সঙ্গে ওই বাজারে অবস্থান করছিলেন। দুর্বৃত্তদের হামলায় ঘটনাস্থলেই তারা নিহত হন। ধীরাজ চাকমা ঢাকা থেকে নৈশবাসে এসে স্বনির্ভরের পানছড়ি স্টপেজে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিলেন। মেধাবী এ প্রকৌশলীর বাড়ি পানছড়ি উপজেলার উগলছড়ি গ্রামে। পরিবারের সঙ্গে ঈদের ছুটি কাটাতে তিনি বাড়ি ফিরছিলেন। রুপন চাকমা স্বনির্ভর এলাকার সুগত চাকমার ছেলে। দীঘিনালা ডিগ্রি কলেজে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে উচ্চ মাধ্যমিকে অধ্যয়নরত এই শিক্ষার্থী ফটোকপি করার জন্য বাসা থেকে বের হওয়ার মাত্র ২০ মিনিটের মাথায় হামলার শিকার হন। আর মহালছড়ি উপজেলায় স্বাস্থ্য সহকারী হিসেবে কর্মরত জিতায়ন চাকমা স্বনির্ভর বাজারে সবজি কিনতে গিয়েছিলেন। কিন্তু দুর্বৃত্তদের বুলেট তার বুকও ঝাঁঝরা করে।
ইউপিডিএফভুক্ত পিসিপির জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক তপন ত্রিপুরা জানান, তপন চাকমার বাড়ি মহালছড়ি উপজেলার চোংড়াছড়ি গ্রামে। পলাশ চাকমার বাড়িও একই উপজেলার মনাটেক গ্রামে।
খাগড়াছড়ি সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক নয়নময় ত্রিপুরা জানান, এ ঘটনায় আহত সমর বিকাশ চাকমা, সুকীরণ চাকমা ও সোহেল চাকমা গুলিবিদ্ধ অবস্থায় হাসপাতালে আসেন। তাদের জরুরি চিকিৎসা দিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।
হামলার পরপর স্বনির্ভর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে সুনসান নীরবতা। কারও মুখে কোনো কথা নেই, চোখেমুখে আতঙ্কের ছাপ স্পষ্ট। দোকানপাটও বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যে যে ক’জনকে দেখা গেল, তাদের কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি।
খাগড়াছড়ি সদর থানার ওসি সাহাদাত হোসেন টিটো বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যাই। মরদেহ উদ্ধারের পাশাপাশি আহতদের হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ওই এলাকায় প্রতিদিন পুলিশ টহল দেয়। কিন্তু গতকাল পুলিশ পৌঁছার আগেই গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। গুলিতে পুলিশের তল্লাশি চৌকির দেয়ালও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঘটনাস্থলে ভারী অস্ত্রের গুলির খোসা পাওয়া গেছে।
এদিকে, গতকাল রাতে নিহত সাতজনের মধ্যে চারজনের লাশ তাদের পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। যে চারজনের লাশ পরিবারকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা হলেন- প্রকৌশলী ধীরাজ চাকমা, জিতায়ন চাকমা, কলেজছাত্র রুপন চাকমা এবং সন কুমার চাকমা। ওসি সাহাদাত হোসেন এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি আর জানিয়েছেন, পলাশ চাকমা, তপন চাকমা ও এলটন চাকমার লাশ হাসপাতাল মর্গে রয়েছে। তাদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হচ্ছে। স্বজনরা এলে লাশগুলো হস্তান্তর করা হবে।
জেলা পুলিশ সুপার আলী আহমদ খান বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। জেলার সন্ত্রাসপ্রবণ এলাকাগুলোয় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। নিরাপত্তা চৌকি ছাড়াও বিভিন্ন স্থানে তল্লাশিও জোরদার করা হয়েছে। হামলায় জড়িতদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে।
এদিকে হামলার খবর পেয়ে স্থানীয় সাংসদ ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা দলীয় নেতাদের নিয়ে হাসপাতালে যান। তিনি আহতদের খোঁজখবর নেন। ওই সময় তিনি বলেন, এ ধরনের মৃত্যু দুঃখজনক ও অনাকাঙ্ক্ষিত। তার সঙ্গে উপস্থিত জেলা প্রশাসক মো. শহিদুল ইসলাম এবং পুলিশ সুপার আলী আহমদ খানকে জেলার আইন-শৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখাসহ জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশনা দেন তিনি।
দ্বিতীয় দফা হামলা :স্থানীয় সূত্র জানায়, স্বনির্ভর এলাকার সমাবেশে যোগ দিতে মিছিল নিয়ে আসার সময় পেরাছড়া ব্রিজের সামনে ইউপিডিএফ সমর্থকদের ওপর দ্বিতীয় দফা সশস্ত্র হামলা চালানো হয়। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে মিছিল লক্ষ্য করে গুলি চালায় দুর্বৃত্তরা। এতে নারীসহ চারজন গুলিবিদ্ধ হন। তারা হলেন- সন কুমার চাকমা, খাগড়াছড়ি সরকারি কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্রী ঊর্মি চাকমা, গুলকানা গ্রামের বাসিন্দা মিনু চাকমা ও শিবন্দির এলাকার সোনা রঞ্জন চাকমা। খাগড়াছড়ি হাসপাতালে নেওয়ার পর সন কুমার চাকমার মৃত্যু হয়।
ইউপিডিএফের বিবৃতি :ইউপিডিএফ খাগড়াছড়ি জেলা ইউনিটের ভারপ্রাপ্ত প্রধান সংগঠক উজ্জ্বল স্মৃতি চাকমা, গণতান্ত্রিক যুব ফোরামের কেন্দ্রীয় সভাপতি অংগ্য মারমা, বৃহত্তর পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের (পিসিপি) সভাপতি বিনয়ন চাকমা ও শ্রমজীবী ফ্রন্টের (ওয়ার্কার্স ফ্রন্ট) সভাপতি সচিব চাকমা যুক্ত বিবৃতিতে হামলার ঘটনার জন্য সংস্কারপন্থি জনসংহতি ও নব্য মুখোশধারীদের দায়ী করেছেন। বিবৃতিতে তারা অভিযোগ করেন, স্বনির্ভর বাজারে পুলিশের একটি তল্লাশি চৌকি থাকলেও হামলার সময় তারা দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে। ফলে দুর্বৃত্তরা সশস্ত্র হামলা চালিয়েও নির্বিঘ্নে পালিয়ে যেতে পেরেছে। তারা দুর্বৃত্তদের বিরুদ্ধে গণপ্রতিরোধ জোরদার করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, সংস্কারপন্থি জনসংহতি ও নব্য মুখোশধারীরা পুরোপুরি গণবিরোধী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। একমাত্র গণপ্রতিরোধের মাধ্যমেই তাদের পরাস্ত করা সম্ভব।
অভিযোগের বিষয়ে কথা বলতে সংস্কারপন্থি জনসংহতি সমিতির কেন্দ্রীয় তথ্য ও প্রচার সম্পাদক সুধাকর ত্রিপুরার মোবাইলে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
from BdNews24 https://ift.tt/2My0UnM
No comments:
Post a Comment